ইলেকট্রনিক সিগারেট বা ভ্যাপিং

সেদিন স্টুডেন্টকে পড়িয়ে বের হচ্ছি। পিছন থেকে শুনলাম সে তার মাকে চিৎকার করে বলছে, “আম্মু আমার ভ্যাপারটা চার্জ হইছে?”

আমি একটু চমকে গেলাম। সিঁড়িতে চলে এসেছি। তাও ঘুরে দাঁড়ালাম। কান খাড়া করে রাখলাম। শুনলাম স্টুডেন্ট এবার তার বড় বোনকে বলছে, “আপু তোমার ফোনটা পরে চার্জ দাও। আমি বাইরে যাব, ভ্যাপারটায় একদম চার্জ নাই।”

এখন অনেকের কাছে প্রশ্ন জাগতে পারে ভ্যাপিং বা ই-সিগারেট আসলে কী?

ইলেকট্রনিক সিগারেট বা ই-সিগারেট ব্যাটারি চালিত এক ধরনের যন্ত্র। এর ভেতরে থাকে নিকোটিনের দ্রবণ যা ব্যাটারির মাধ্যমে গরম হয়। এর ফলে ধোঁয়া তৈরি হয়। এটি মস্তিষ্কে ধূমপানের মতো অনুভূতির সৃষ্টি করে। একসময় যারা ধূমপান ছেড়ে দিতে চাইতেন তারা এটা পান করতেন। অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো ব্যাপার।

কিন্তু সময় গড়িয়েছে। ই-সিগারেট নিয়ে অনেক গবেষণা এবং জরিপ পরিচালিত হয়েছে। সেসব গবেষণা এবং জরিপে উঠে এসেছে ভয়ংকর সব তথ্য।

আসল সিগারেটের ধোয়া পান করা যে ক্ষতিকর সেটি তো আর নতুন করে বলার কিছু নেই। মার্কিন এক গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, সাধারণ সিগারেটে প্রায় সাত হাজার ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য রয়েছে যার মধ্যে ৬৯টি সরাসরি ক্যানসারের জন্য দায়ী।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসছে, তাহলে ইলেকট্রিক সিগারেট আসলে কতটা নিরাপদ সে ব্যাপারে। কারণ, এই সিগারেটের ভেতরে নিকোটিন, প্রোপাইলিন গ্লাইকল অথবা ভেজিটেবল গ্লিসারিন এবং সুগন্ধী মিশ্রিত থাকে। গবেষকরা বলছেন, যারা ই-সিগারেট সেবন করছেন তাঁদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। দি নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, ই-সিগারেটে আছে জীবাণুনাশক ফরমালডিহাইড, যেটি ক্যানসার তৈরির উপাদান।

প্রথম দিকে ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞরা সিগারেট ছেড়ে দেওয়া জন্য ভ্যাপিং-এর পরামর্শ দিতেন। কিন্তু একটা সময় দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্রে হঠাৎ করে ফুসফুস জনিত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। আর আশংকার বিষয় হলো এদের অধিকাংশই তরুণ এবং ই-সিগারেট গ্রহণকারী।

নড়ে-চড়ে বসল প্রশাসন। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কথা বললেন ই-সিগারেট নিষিদ্ধের ব্যাপারে। তারা কোনোভাবেই তাদের তরুণদের বিপথে ঠেলে দিতে চান না।

কিন্তু প্রশাসনের এই নড়েচড়ে বসা যে বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেল। ইতোমধ্যেই ই-সিগারেট গ্রহণ অনেকটা হালের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। সেই ফ্যাশন মার্কিন মুলুক থেকে পৌঁছে গেছে বাঙাল দেশেও। বিশেষত টিনএজদের মধ্যে এই ই-সিগারেট গ্রহণের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

ইলেকট্রিক সিগারেট নিয়ে দীর্ঘসময় ধরে বিতর্ক চলছে। স্কটল্যান্ডে এক জরিপে দেখা গেছে, তরুণদের অনেকে ইলেকট্রিক সিগারেট ব্যবহার করে পরে ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব কী পড়তে পারে, সে ব্যাপারে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও এখন উঠছে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এই ই-সিগারেট নিষিদ্ধের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ই-সিগারেট আসল সিগারেট থেকে কম বা বেশি ক্ষতিকর কিনা বা ই-সিগারেট ধূমপায়ীর আশেপাশের মানুষজনকে ক্ষতি করে কিনা বা ই-সিগারেট ফ্যাশনের নামে আরো অনেক অধূমপায়ীকে ধূমপানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কিনা আমি সেগুলো নিয়ে কোনো প্রকার তর্কে-বিতর্কে গেলাম না। আমার শুধু চিন্তার বিষয় আমার স্কুলগামী ছাত্রটাকে নিয়ে।

বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা এমন আরো হাজার হাজার টিনএজদের নিয়ে। আর চিন্তার বিষয়টা তারা যে ই-সিগারেট গ্রহণ করছে সেটাও না। চিন্তার বিষয়টা হলো— তারা যে তাদের অসচেতন বাবা-মায়ের সামনে ভ্যাপিংকে একটা স্বাভাবিক বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করছে সেটা, ই-সিগারেটকে যে তারা নিছক একটা খেলনা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে সেটা।

আমার স্টুডেন্টের মা হয়তো একসময় বুঝতে পারবে তার ছেলের যত্ন করে চার্জ দেয়া বস্তুটা আসলে কোনো খেলনা নয়, একটা মারণাস্ত্র। আর সব বাবা-মায়েরাও হয়তো অমনি করে বুঝতে পারবে। কিন্তু ততোদিনে কী তাদেরকে আর ফেরানোর পথ থাকবে? কোনো উপায় থাকবে? ইট’স এলার্মিং, রিয়ালি এলার্মিং!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *