মানুষ এবং মনুষ্যত্ব

আর্টিকেল: সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। মানুষেরই রয়েছে বিবেক, বুদ্ধি, মননের চর্চা যা তাকে সত্যে উপনীত হতে বরাবরই সাহায্য করে। চিন্তা ও মনন যদি রুদ্ধ হয় তবে তার সৃষ্টিশীলতাও মুক্ত থাকতে পারে না। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন-‘মানুষ যদি হতে চাও, মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করো’। এই অর্থে মনুষ্যত্ব হচ্ছে – প্রেম, দয়া, বিনয়, ধৈর্য, করুণা, সততা, সত্যবাদিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস, নির্ভরযোগ্যতা, ক্ষমাশীলতা, সাহস, বিচারশীলতা ইত্যাদি গুণের বিকাশ।

মনুষ্যত্ব অর্জনে মানুষের অন্তর্গত ইচ্ছাশক্তি, চিন্তাশক্তি, শ্রমশক্তি ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মানুষ সামাজিক প্রথা ও রীতি নীতি কিংবা রাষ্ট্রীয় বিধি-বিধানের শৃঙ্খলে আবদ্ধ কিন্তু দাস নয়, মানুষ তার নিজ প্রবৃত্তির দাসও নয়। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে নিহিত রয়েছে এমন এক শক্তি যার রূপান্তরের মাধ্যমে মানুষ নিজের মাঝেই মহীয়ান হয়ে জাগ্রত করতে পারে তার মনুষ্যত্ব।

মানুষ তৃষ্ণার্ত হলে পান করতে চায়, ক্ষুধা লাগলে খেতে চায়, ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নিতে চায় কিন্তু একই সাথে তৃষ্ণার্ত হলেও অন্যকে তৃষ্ণার্ত রেখে সে একাই তার তৃষ্ণা নিবারণ করতে চায় না, ক্ষুধা পেলেও সে প্রিয়জনকে অভুক্ত রেখে নিজে খেয়ে তৃপ্ত হয় না কিংবা অন্যের উপর কর্মের বোঝা চাপিয়ে নিজে বিশ্রাম নিতে অস্বস্তি বোধ করে। মানুষের মানবিক অনুভূতি অন্যের কষ্ট দেখলে কেঁদে উঠে। অন্যকে রক্ষা করা, অন্যের সাথে খাদ্য, বিশ্রাম, কর্ম ভাগাভাগি করে গ্রহণ করা মনুষ্যত্বেরই অন্তভূক্ত।

সঠিক ভাবে জ্ঞান অর্জন বাধ্যতামূলক। পবিত্র কুরআনে সর্বাধিক সংখ্যক ৯২ বার জ্ঞান অর্জনের কথা বলা হয়েছে। কেননা জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই বান্দা নিজেকে ও স্রষ্টা কে চিনতে পারে। স্রষ্টা সৃষ্টির প্রারম্ভ পুর্বে জ্ঞানদানের মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভিত রচনা করেছেন। বই পড়ার অভ্যাস মানবপ্রবৃত্তির অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য যা মনুষ্যত্ব বিকাশে সহায়ক। এর সাথে জড়িয়ে আছে মানব সন্তানের মূলীভূত সত্য কথা। আর সেই সাথে মন দিয়ে সত্য বচন শ্রবণ আর তা কর্মে ধারন করাও মনুষ্যত্ব বিকাশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।

উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষকে সর্বদা কুড়েকুড়ে খায়। এর মাঝেই আবার জন্ম নেয় অল্পে তুষ্ট থাকা কিছু মানুষ। যারা যা পাচ্ছে তাতেই খুশি, আশা করছে না তারচেয়ে বেশি কিছু। উচ্চাকাঙ্ক্ষা একদিকে আমাদের বড় করে তোলে আবার এটি টেনে নামিয়ে আনতেও পারে। উচ্চাকাঙ্ক্ষারও প্রয়োজন রয়েছে লিমিটেশনের। তাই অল্পে তুষ্ট থাকা ও ভালো কিছুর জন্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা মনুষ্যত্বের অন্তভূক্ত।

মনুষ্যত্ব বিকাশের জন্যে দরকার সম্প্রীতি চর্চা। তাই মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করার জন্য এমন একটা পরিবেশে থাকতে হয় যেখানে মনুষ্যত্বের চর্চা হয়। কাগজের টুকরো গোলাপের সাথে থাকলে কাগজও গোলাপের সুবাস প্রাপ্ত হয়। আবার গোলাপও নর্দমায় থাকলে নর্দমার দুর্গন্ধ প্রাপ্ত হয়। রসহীন বালিতে উত্তম বীজ রোপন করলেও এ থেকে কোন উদ্ভিদ জন্মায় না। অন্যদিকে উপযুক্ত পরিবেশ ও যত্নে দুর্বল বীজ থেকেও ভালো উদ্ভিদের সৃষ্টি হয়। স্বার্থের হানাহানিতে দূষিত কোন পরিবেশে থাকলে মানুষ নিজের অজান্তেই দুষিত হয়।

প্রত্যেক ধর্মই মনুষ্যত্ব বিকাশের কিছু উপায় নির্দেশ করেছে দেশ ও কালের পরিপ্রেক্ষিতে। অন্যায় অবিচার, শোষণ, পীড়ন-প্রতারণা ইত্যাদির অবসান ঘটিয়ে পৃথিবীতে আনন্দময়, সম্প্রীতি, সমৃদ্ধ ও সুন্দর জীবন প্রতিষ্ঠার তাগিদ রয়েছে প্রতিটি শাস্ত্রে। ধর্মের উদ্ভব ঘটেছে জাতির, রাষ্ট্রব্যবস্থার, সমাজব্যবস্থার দুঃসময়ে। তাই দুর্দিন অতিক্রম করে সুদিন প্রতিষ্ঠার, অন্ধকার যুগকে পেছনে ফেলে সমৃদ্ধ নবযুগ সৃষ্টির পথনির্দেশ ও অঙ্গীকার আছে প্রত্যেক ধর্মে। ধর্ম মানুষকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছে মানবিক মূল্যবোধ চর্চার আর মনুষ্যত্বের।

দিনশেষে এই হোক অংগীকার, শুধু লোক দেখানোর জন্যে নয়, মননে চরিত্রে কর্মে সর্বক্ষত্রেই রাখবো মনুষ্যত্বের ছাপ। মানুষ হয়ে ছদ্মবেশ নয়। সুকর্মের মাধ্যমে সফল করি এই মানব জীবন।

ইমরান মোহাম্মদ খান
দোহা, কাতার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *