খেজুর রস ছাড়াই তৈরি করা হচ্ছে খেজুরের গুড়

জাতীয় আর্টিকেল: শীতকালে খেজুর গুড়ের তৈরি পিঠা ও পায়েশের নাম শুনলেই জিহ্বায় পানি চলে আসে। চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরে শীত মৌসুমে প্রতি বছরের মতো এবারও জমে উঠেছে খেজুরের গুড় উৎপাদন।

এবারেও বেড়েছে খেজুর গুড়ের চাহিদা। যোগানও প্রচুর। তবে তা গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী প্রকৃত খেজুর গুড় নয়। চিনি ও আখের গুড় দিয়ে তৈরী হচ্ছে খেজুর গুড়। এসব গুড় তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে সোডা, গাছের-ছাল ও ফিটকিরিসহ বিপদজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ। এতে খেজুর গুড়ের মৌলিক স্বাদ গন্ধ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এ ধরণের ভেজাল গুড় তৈরি করে দেদারছে হাট-বাজারে কেনা-বেচা করছে। কিন্তু প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদেরর কোনো মাথা ব্যথা নেই।

জানা যায়, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরের উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে দীর্ঘদিনের পাইকারি মোকামে সপ্তাহে (সাতদিনই) কয়েক লাখ মন গুড় বেচাকেনা হয়। হাটগুলোতে মাসে ১৫-২০ কোটি টাকার ব্যবসা চলে। ব্যবসায়ীরা প্যাকেট ও টিনজাত পদ্ধতিতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বাড়তি মুনাফার আশায় প্রতিনিয়তই তৈরি করছেন ভেজাল খেজুর গুড়। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ, সলঙ্গা ও তাড়াশ, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর এবং নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়ায় কমপক্ষে তিনশটি গুড় উৎপাদনকারী কারখানায় অবিরাম ভেজাল গুড় তৈরি করা হচ্ছে।

এভাবে কারখানা খুলে হাজার হাজার মন ভেজাল গুড় তৈরি করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বাজার থেকে নিম্নমানের ঝোলা ও নরম গুড় অল্প দামে কিনে তাতে চিনি, রং, হাইড্রোজ, গাছের-ছাল, সোডা, ফিটকারিসহ রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে খেজুর গুড় তৈরি করছেন। সেই গুড় স্থানীয় হাট-বাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাচ্ছেন।

সরেজমিনে নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারে গুড় তৈরির কারখানায় দেখা যায়, বিভিন্ন বাজার থেকে কিনে আনা নিম্নমানের ময়লাযুক্ত গুড় মেঝেতে নোংরা স্যান্ডেল পায়ে গুড়ো করছে শ্রমিকরা। পাশেই রয়েছে চিনির বস্তা। দিনভর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এই ভেজাল গুড় তৈরি করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তা বাজারজাত করা হচ্ছে।

ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় গুড়ের রং সাদা ও আকর্ষণীয় করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন এসব আসাধু ব্যবসায়ী। প্রকৃত খাঁটি খেজুর গুড় চিনতে না পেরে ক্রেতারা ওই স্বাদ-গন্ধহীন ভেজাল গুড় কিনছেন।

তাড়াশের বড় গুড়ের মোকাম রানীরহাট, ভাদাস, তালম, গুল্টা ও নওগাঁ এবং নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার সবচেয়ে বড় গুড়ের মোকাম চাঁচকৈড় ও নাজিরপুর হাটে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মানভেদে প্রতি কেজি খেজুর গুড় ৭০-৮০ টাকা ও ঝোলা গুড় ৫০টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ হাটে গুড় বিক্রি করতে আসা গুড় উৎপাদনকারী জোনাব আলী, আব্দুল মান্নানসহ অনেকে জানান, তারা প্রতিটি খেজুর গাছের জন্য মালিককে মৌসুমভিত্তিক খাজনা ৩-৪শ` টাকা দিয়ে থাকেন। প্রতি কেজি গুড় উৎপাদনে খরচ হয় জ্বালানি-মজুরীসহ ৮০ টাকা। আর খাঁটি গুড়র উৎপাদন করতে খরচ হয়, গড়ে প্রায় একশ` টাকা।

তাই উৎপাদন খরচ পুষিয়ে নিতে ২০ লিটার খেজুর রসে ৫ কেজি চিনি মেশান তারা। পক্ষান্তরে ২ কেজি চিনি মেশালে গুড় বেড়ে হয় দ্বিগুণ। গুড় শক্ত ও এর রং ফর্সা করতে চিনিসহ বিভিন্ন পদার্থ মেশাতে হয়।

তারা জানান, চিনিমুক্ত গুড়ের রং হয় কালো। তাতে প্রকৃত স্বাদ-গন্ধ অটুট থাকে। এই গুড় প্রতি কেজি কমপক্ষে ১০০-১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়।

ঢাকা থেকে আসা পাইকার হানিফ আলী ও সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে আসা আসমত ব্যাপারী জানান, খেজুর গুড়ের সেই ঐতিহ্য আর নেই। প্রান্তিক পর্যায়ের মৌসুমি গুড় উৎপাদনকারী ও মহাজন সবাই ভেজাল গুড় তৈরি করছেন। তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই ক্ষতিকারক রাসায়নিক মিশিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছেন।

এ ব্যপারে ডাক্তার মো. হাফিজুর রহমান মিলন (সিরাজগঞ্জ) জানান, খেজুর গুড়ে চিনি, হাইড্রোজ, সোডা, রং, ফিটকারির মত ভেজাল মিশ্রণের কারণে কিডনি ড্যামেজ, খাদ্যনালীতে ক্যান্সার, লিভারে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল করিম জানান, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে ৬৮ হাজার ৮৯০টি খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে রস দেয়ার উপযোগী গাছের সংখ্যা রয়েছে ৪১ হাজার ৮১০টি।

পরিসংখ্যান মতে, প্রতিটি গাছ বছরের শীত মৌসুমে ১৮০ লিটার রস দেয়। প্রতি ২০ লিটার খেজুর রসে ২ কেজি গুড় হয়। সেই হিসেবে ৭২০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদিত হবে। এতে প্রতি কেজি গুড় উৎপাদক পর্যায়ে ৭০ টাকা কেজি দরে বাজারে আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬ কোটি টাকার উপরে।

আব্দুল করিম বলেন, ইটভাটার কারণে এলাকায় খেজুর গাছের সংখ্যা কমে গেছে ৪০ শতাংশেরও বেশি। তারপরও চলনবিল এলাকার ৯ উপজেলায় এখনও প্রচুর খেজুর গাছ রয়েছে। এগুলো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারলে হারিয়ে যাওয়া আসল খেজুর গুড়ের স্বাদ ও ঐতিহ্য ফিরে পাওয়া সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *