স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যান রাশিয়াতে

 

রফিকুল আলম খান:
আপনি সদ্য কলেজ /বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছেন। গতানুগতিক ধারনার পিছনে না ছুটে আপনার চিন্তা ভিন্ন কিছু করার। আপনার ইচ্ছা নিজেকে আরো ভালভাবে প্রস্তুত করে বিশ্ববাজারের একজন দক্ষ পেশাজীবী হওয়ার। এর জন্য আপনি সংকল্পবদ্ধ হয়েছেন যে ইউরোপ এর কোন দেশ থেকে উচ্চতর শিক্ষাগ্রহন করবেন।

আপনার স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিতে সহায়তা করবে ‘রাশিয়ান গভনর্মেন্ট স্কলারশিপ’। প্রতি বছর রাশিয়ার সরকার প্রায় ১৫০০০ বৃত্তি দিয়ে থাকে বিদেশী শিক্ষার্থীদের রাশিয়াতে এসে পড়াশোনা করার জন্য। চলতি ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৩ জন ছাত্র-ছাত্রী বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক, স্নাতোকত্তর ও পি এইচ ডি পর্যায়ে পড়াশোনা করার জন্য সরকারী বৃত্তি নিয়ে রাশিয়াতে পাড়ি জমিয়েছেন।

২০১৪ থেকে এই পর্যন্ত প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী মস্কোর স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ন্যাশনাল রিসার্চ নিউক্লিয়ার ইউনিভার্সিটি ‘মেফি’ তে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। তারা দেশে ফিরে আসার পর রুপপুর পরমানু বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাকরির ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন।

কেন রাশিয়ায় পড়তে যাবেন?
রাশিয়া নামটি অনেক কারণে পরিচিত, তবে এর একটি বিশেষ পরিচয় হলো উচ্চ শিক্ষার জন্য। রাশিয়া- বলশেভিক বিপ্লবের দেশ। পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসেবে কমিউনিজমকে দেশের শাসনতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে তারাই। মহাকাশে সর্বপ্রথম পৃথিবীর কক্ষপথে রকেট প্রেরণ থেকে শুরু করে মৌলের বিন্যাসের জন্য পর্যায় সারণির উদ্ভাবনসহ আরো অনেক কিছুর উৎপত্তি এই রাশিয়াতেই।

রাশিয়ার কঠোর শিক্ষাব্যবস্থার কারণেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবনের দিক দিয়ে বর্তমানবিশ্বে তারা নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু কিভাবে রাশিয়া এই বিষয়গুলো কে সম্ভব করছে। কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে এর পেছনে রয়েছে দেশটির গবেষণাকেন্দ্রিক সুপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান। যুগ যুগ ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই লেলিন, ট্রটক্সির মতো রাজনীতিবিদ, দস্তয়ভস্কি ও তলস্তয় এর মতো সাহিত্যিক এবং মেন্ডেলিফের মতো বিজ্ঞানীদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও মনস্তাত্বিক গঠনে আতুরঘর হিসেবে কাজ করেছে।

রাশিয়ার বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন ওয়ার্ল্ড রাঙ্কিং এর উপরের সারিতে অবস্থান করছে। যেমন, মস্কোর ‘হায়ার স্কুল অব ইকোনমিক্স’ এর অবস্থান কিউ এস ওয়ার্ল্ড রাঙ্কিং এ ১৫০ এর ভিতরে। একটি জরীপে দেখা গেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় শতভাগ গ্রাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পরপরই চাকরি পেয়ে যান।

রাশিয়াতে স্কলারশীপ আবেদনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল আপনার আইএলটিস স্কোর এর প্রয়োজন নেই। পূর্ববর্তী শিক্ষাজীবনে ভালো ফলাফল ও স্কলারশীপ পাওয়ার জন্য ইন্টারভিউ এ ভালো করতে পারলেই আপনি রাশিয়াতে আপনার কাঙ্ক্ষিত বিষয় ও পছন্দনীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনামুল্যে পড়াশোনা করার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি পাবেন রাশিয়ার সরকারের কাছ থেকে মাসিক কিছু ভাতা।

২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে স্কলারশিপে আবেদনের নিয়মাবলী:
২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আবেদন শুরু হতে পারে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে। চলতে পারে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত। আপনি যদি ব্যাচেলর ডিগ্রী, মাস্টার্স ডিগ্রী অথবা পি. এইচ. ডির জন্য স্কলারশীপের আবেদন করতে চান তাহলে আপনাকে ঢাকাস্থ রুশ বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্র থেকে স্কলারশিপে আবেদনের জন্য নির্ধারিত ফরম সংগ্রহ করতে হবে। পুর্ববর্তী শিক্ষাজীবনের (এস এস সি, এইচ এস সি ও স্নাতক পর্যায়ের) সার্টিফিকেট এবং মার্কশীটসমূহ যথাক্রমে বোর্ড/ বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত করে উপরিউক্ত ফরমটি পূরণপূর্বক রুশ বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্র জমা দিতে হবে। এরই সাথে আপনাকে যুক্ত করতে হবে পাসপোর্টের কপি (কমপক্ষে ১৮ মাস মেয়াদ থাকতে হবে), সদ্য তোলা ৪ কপি ছবি এবং মেডিকেল সার্টিফিকেট।

আপনার আবেদন যাচাই বাছাই করে আপনাকে ইন্টারভিউ এর জন্য ডাকা হবে। প্যানেল ইন্টারভিউতে যদি আপনি সফল হতে পারেন তাহলে হয়তোবা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হবে স্কলারশীপ পাওয়ার বিষয়টি। তাই এখন থেকেই আবেদনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকুন। বিস্তারিত তথ্য জানতে যোগাযোগ করুন রাশিয়ান বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের শিক্ষা বিভাগীয় প্রধান সৈয়দ বজলুল হাসান রাজীব, ৪২ ভাষা সৈনিক এম এ মতিন সড়ক, ধানমন্ডি আ/এ, ঢাকা।

কি কি করবেন রাশিয়ায় যাওয়ার পর
আপনাকে প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে, কারণ স্কলারশীপ এর ছাত্র হিসেবে আপনি যদি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন তাহলে আপনাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে। চেষ্টা করবেন শিক্ষকদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার যেন আপনি তাদের অধীনে ভালো গবেষণা করার সুযোগ পান। মাস্টার্সে ভালো ফল ও গবেষণাপত্র থাকলে আপনি হয়তো আপনার পাঠরত বিশ্ববিদ্যালয়েই আবার পি এইচ ডি করার সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন।

রাশিয়াতে যাওয়ার পর শুধু যে আপনি পড়াশুনায় ব্যস্ত থাকবেন তা কিন্তু নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ রাশিয়ার সীমান্ত রয়েছে প্রায় ১৪ টি দেশের সাথে।তাই গ্রীষ্মের ছুটিতে আপনি আপনার বন্ধু কিংবা সহপাঠীদের নিয়ে ঘুরতে যেতে পারেন সোচিতে কৃষ্ণসাগরে গোসল ও সাদা বালুর সৈকতে বার বি কিউ পার্টি করতে। কিংবা ক্রিস্টমাস এর ছুটিতে তীব্র শীতের ভিতরে ছুটে যেতে পারেন সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অথবা তাইগা অঞ্চলে -৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে কাছে থেকে দেখার জন্য। সেখানে আরো সুযোগ রয়েছে তুষারশুভ্র পাহাড়ের চূড়া থেকে স্কিইং আর পৃথিবীর গভীরতম লেক ‘বৈকাল’ এ কায়াকিং করার।

আর যদি রাশিয়ার বিশালতাকে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চান তাহলে টিকেট কিনে চেপে বসুন ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ের কোন একটি ট্রেনে। মস্কো থেকে এর একটি লাইন চলে গেছে চীনের বেইজিং এ এবং অন্য একটি লাইন গেছে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলান বাটোরে। প্রায় ০৮ দিনের একটি ট্রেন ভ্রমনে আপনি রাশিয়ার প্রধান শহর, অঞ্চল এবং সর্বোপরি আপনি রাশিয়ার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ভালো একটা ধারণা পাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *